ধর্মীয় জ্ঞান

আলোচনায় ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ

জুম'আর খুতবা (২১শে আগস্ট, ২০২৬)

ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ নিয়ে আমার অবস্থান। কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও যুক্তির আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পর্যালোচনা:

ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ নিয়ে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন এটি সুন্নাহসম্মত, কেউ বলেন এটি বিদআত। আবার কেউ মিলাদকে ভালোবাসার অপরিহার্য প্রমাণ মনে করেন, কেউ এর প্রচলিত আয়োজনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

আমি বিষয়টিকে আবেগ, দলীয় পরিচয় কিংবা কারও ব্যক্তিগত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে দেখতে চাই না। বরং কুরআন, সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল, শরিয়তের মূলনীতি এবং বাস্তবতার আলোকে আমার অবস্থান তুলে ধরছি।

আমার বক্তব্যের মূল কথা হলো- «আমি নবী ﷺ-এর জন্মের আনন্দ, তাঁর জীবন আলোচনা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর সুন্নাহ প্রচারের পক্ষে। কিন্তু মিলাদের নামে প্রচলিত প্রতিটি অনুষ্ঠানকে সুন্নাহ বলে দাবি করার পক্ষে নই।»

১. নবী ﷺ-এর জন্ম কি আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়?

উত্তর: অবশ্যই।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

«قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ»

“বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে তারা যেন আনন্দিত হয়। এটি তারা যা সঞ্চয় করে তার চেয়ে উত্তম।” — সূরা ইউনুস: ৫৮

প্রশ্ন হলো—আল্লাহর সবচেয়ে বড় রহমতগুলোর একটি কী?

আল্লাহ বলেন—

«وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ»

“আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”

— সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭

অতএব, নবী ﷺ নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আল্লাহর বিরাট রহমত।

তাই তাঁর জন্মের কথা স্মরণ করে আনন্দিত হওয়া, তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা এবং তাঁর জীবন আলোচনা করা—এগুলোকে শুধু “নবীপ্রেমের বিরোধিতা” হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।

২. নবী ﷺ নিজে তাঁর জন্মদিন স্মরণ করেছেন কি?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি হলো—

নবী ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

«ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ»

“এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি।” — সহিহ মুসলিম

অর্থাৎ নবী ﷺ সোমবারের সঙ্গে নিজের জন্মের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন এবং সেই দিনে রোজা রেখেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে: নবী ﷺ তাঁর জন্মের দিনের কথা স্মরণ করেছেন।

তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য—  তিনি সোমবারের রোজা রেখেছেন; তিনি বর্তমান যুগের প্রচলিত জুলুশ বা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান করার নির্দেশ দেননি।

তাই এখান থেকে আমাদের খুব ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আমি বলব: জন্মের দিন স্মরণ করার একটি সুন্নাহসম্মত দৃষ্টান্ত হাদিসে আছে।

কিন্তু- আজকের প্রচলিত প্রতিটি মিলাদ অনুষ্ঠানকে হুবহু সেই সুন্নাহ বলা যাবে না।

৩. নবী ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা কি ঈমানের অংশ?

উত্তর: অবশ্যই।

নবী ﷺ বলেছেন—

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” — সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

তাহলে নবী ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা কোনো সামান্য বিষয় নয়।

কিন্তু ভালোবাসার প্রমাণ কী?

আল্লাহ বলেন—

«قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ»

“বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”

— সূরা আলে ইমরান: ৩১

খেয়াল করুন— আল্লাহ ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে অনুসরণ চেয়েছেন।

তাই নবী ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে আনন্দ করা ভালোবাসার প্রকাশ হতে পারে; কিন্তু সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা।

৪. তাহলে মিলাদ কি সুন্নাহ?

এখানে শব্দ ব্যবহারে সতর্ক হওয়া দরকার।

যদি “মিলাদ” বলতে বোঝানো হয়—

- নবী ﷺ-এর জন্মের কথা স্মরণ করা,
- তাঁর জীবনী আলোচনা করা,
- দরুদ পড়া,
- তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা,
- তাঁর সুন্নাহ শেখানো,
- মানুষকে তাঁর আদর্শ অনুসরণের দিকে আহ্বান করা,

তাহলে এগুলোর প্রতিটিরই শরিয়তে আলাদা আলাদা ভিত্তি রয়েছে।

আল্লাহ বলেন— «إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا»

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথ সালাম পেশ করো।” — সূরা আল-আহযাব: ৫৬

সুতরাং নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ পড়া নিঃসন্দেহে সুন্নাহ।

তাঁর জীবন আলোচনা করা?

নবী ﷺ-এর জীবনী জানা তো দ্বীনেরই অংশ।

তাঁর চরিত্র অনুসরণ করা?

এটাই তো কুরআনের নির্দেশ।

আল্লাহ বলেন—

«لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ»

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।”

— সূরা আল-আহযাব: ২১

তাই এসব কাজকে একত্র করে নবী ﷺ-এর জীবন ও আদর্শ আলোচনা করা—এটি ভালো কাজের একটি সমাবেশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

কিন্তু নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান, নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে ‘নবী ﷺ কর্তৃক নির্ধারিত সুন্নাহ’ বলা আলাদা দাবি।

এখানেই সতর্কতা প্রয়োজন।

৫. “শরিয়তে তো ঈদ মাত্র দুটি”—এ কথার ব্যাখ্যা কী?

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে।

বার্ষিক শরিয়ত-নির্ধারিত ঈদ হলো—

ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।

নবী ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন মানুষ দুটি দিনে আনন্দ-উৎসব করত। তিনি বললেন—

«إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ»

“আল্লাহ তোমাদের সেই দুই দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—কুরবানির দিন এবং ফিতরের দিন।” — সুনান আবু দাউদ

তাই বার্ষিক শরিয়ত-নির্ধারিত ঈদ হিসেবে দুটি ঈদই মূল।

কিন্তু “ঈদ” শব্দটি সব জায়গায় শুধু বার্ষিক উৎসব অর্থে ব্যবহৃত হয় না।

নবী ﷺ জুমার দিন সম্পর্কে বলেছেন—

«إِنَّ هَذَا يَوْمُ عِيدٍ جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ»

“এটি এমন একটি ঈদের দিন, যা আল্লাহ মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।” — সুনান ইবনে মাজাহ

অতএব “ঈদ” শব্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে ভাষাগত অর্থ এবং শরিয়তের নির্ধারিত বার্ষিক ঈদ—দুটিকে এক করে ফেলা ঠিক নয়।

৬. “সকল ঈদের সেরা ঈদ”—এই কথাটি কীভাবে বলা উচিত?

আমার মতে, এখানে আবেগের পরিবর্তে ভাষার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত।

আমরা বলতে পারি— “নবী ﷺ-এর জন্ম মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি; তাই তাঁর জন্মের কথা স্মরণ করে আনন্দিত হওয়া স্বাভাবিক।”

কিন্তু— “শরিয়তের নির্ধারিত ঈদগুলোর মধ্যে মিলাদই শ্রেষ্ঠ ঈদ”—

এমন বক্তব্যের জন্য সরাসরি দলিল প্রয়োজন।

অতএব আমি প্রথম বক্তব্যটি গ্রহণ করব, দ্বিতীয়টি দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকব।

৭. সাহাবায়ে কেরাম কি মিলাদ পালন করেছেন?

এখানে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।

যারা মিলাদের পক্ষে বলেন, তারা বলেন—নবী ﷺ সোমবার রোজা রেখে নিজের জন্মের দিন স্মরণ করেছেন। এটি একটি শক্তিশালী দলিল যে জন্মের দিন স্মরণ করা সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো বিষয় নয়। অন্যদিকে যারা মিলাদের বিরোধিতা করেন, তারা বলেন—

সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগে বর্তমান প্রচলিত নির্দিষ্ট বার্ষিক মিলাদ অনুষ্ঠান ছিল না। এই আপত্তিটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

তাই আমার সিদ্ধান্ত: নবী ﷺ-এর জন্ম স্মরণ করার মূল বিষয়কে অস্বীকার করব না।

আবার—পরবর্তী যুগে তৈরি হওয়া প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতাকে সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহ বলব না।

এটাই আমার কাছে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান।

৮. বিদআত নিয়ে হাদিস কী বলে?

নবী ﷺ বলেছেন—

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ»

“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” — সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

আরেক হাদিসে এসেছে— «وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ»

“সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ; আর প্রত্যেক বিদআত হলো ভ্রষ্টতা।”

— সহিহ মুসলিম

এই হাদিসগুলোকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

তাই কোনো কাজকে “নবী ﷺ-এর নির্ধারিত ইবাদত” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই দলিলের প্রয়োজন।

৯. কিন্তু নতুন কোনো ভালো ব্যবস্থা কি সবসময় বিদআত?

এখানেও একটু চিন্তা করা দরকার।

উদাহরণ হিসেবে— কুরআন এক মলাটে সংকলন করা, হাদিস লিখিত গ্রন্থে সংকলন করা, মাদরাসার ক্লাসের সময়সূচি তৈরি করা, মাইক্রোফোন ব্যবহার করা—এসব নবী ﷺ-এর যুগে এই বর্তমান রূপে ছিল না।

তাই কোনো নতুন বিষয় দেখলেই “বিদআত” বলে ফেলা যথেষ্ট নয়।

মূল প্রশ্ন হলো— এটি কি দ্বীনের মধ্যে নতুন ইবাদত হিসেবে যোগ করা হচ্ছে, নাকি শরিয়তসম্মত কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের নতুন মাধ্যম?

এখানে আলেমদের মধ্যে “বিদআত” শব্দের সংজ্ঞা ও প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

তাই মতভেদকে সরাসরি ঈমান-কুফরের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

১০. মিলাদের বিরোধীদের কি কাফের বলা যাবে?

উত্তর: না।

একজন মুসলমান মিলাদকে বিদআত মনে করে পালন না করলে তাকে কাফের বলা যাবে না।

কারণ কোনো নির্দিষ্ট আমল নিয়ে মতভেদ হওয়া আর রাসুল ﷺ-কে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।

বরং তাকফিরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি।

নবী ﷺ বলেছেন— «إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا»

“কেউ তার ভাইকে ‘হে কাফের’ বললে তা দুজনের একজনের ওপর ফিরে আসে।”

— সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

তাই আমি স্পষ্টভাবে বলব— মিলাদ না পালনকারী মুসলমানকে কাফের বলা যাবে না।

১১. তাহলে জশনে জুলুশ সম্পর্কে আমার অবস্থান কী?

আমার কাছে জুলুশকে একটি সামাজিক আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।

যদি এতে হারাম কিছু না থাকে এবং এটিকে শরিয়তের নির্ধারিত ফরজ/ওয়াজিব বা স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে মনে না করা হয়, তাহলে এটিকে সামাজিকভাবে বৈধ বলার সুযোগ আছে।

কারণ ইসলামের একটি সাধারণ নীতি হলো—

«وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى»

“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো।” — সূরা আল-মায়েদা: ২

তবে একই আয়াতের পরেই আল্লাহ বলেন— «وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ»

“পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।”

তাই জুলুশে যদি—

- অশ্লীলতা,
- নারী-পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা,
- গান-বাজনা নিয়ে শরিয়তবিরোধী পরিবেশ,
- মানুষের চলাচলে অযথা কষ্ট,
- রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া,
- অপচয়,
- অহংকার বা প্রদর্শন,

এসব যুক্ত হয়, তাহলে সেই অংশ অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

১২. আমি নিজে জুলুশে যাই না কেন?

এটাই হয়তো আমার অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমি জুলুশে না যাওয়াকে মিলাদের বিরোধিতা মনে করি না।

আমি মনে করি— "একটি কাজ বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকা আর সেটিকে নিজের জন্য উত্তম মনে করা—দুটি ভিন্ন বিষয়।»

আমি যদি মনে করি কোনো আয়োজনের কারণে নবী ﷺ-এর প্রকৃত সুন্নাহ মানুষের কাছে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, তাহলে আমি সেটি এড়িয়ে চলব এবং মানুষকেও বিকল্প সুন্দর পদ্ধতির দিকে আহ্বান করব।

১৩. একটি সহজ উদাহরণ

মসজিদে প্রবেশ করা তো জায়েজ।

কিন্তু নবী ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন— ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা এবং দোয়া পড়া।

এখন কেউ যদি শুধু মসজিদে ঢুকে যায়, তার প্রবেশ হারাম হয়ে যাবে না।

কিন্তু আমরা যদি এমন পরিবেশ তৈরি করি যেখানে মানুষ ডান পা দিয়ে প্রবেশ ও মসজিদের দোয়ার সুন্নাহই ভুলে যায়, তাহলে আমাদের দায়িত্ব হবে সুন্নাহকে আবার জীবিত করা।

ঠিক একইভাবে— আমি কোনো একটি আয়োজনকে মূলত সামাজিকভাবে বৈধ মনে করলেও যদি দেখি সেই আয়োজনই মানুষের কাছে নবী ﷺ-এর প্রকৃত সুন্নাহর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তাহলে আমি সেই পদ্ধতির বিরোধিতা করতে পারি।

এটি নবী ﷺ-এর বিরোধিতা নয়।

বরং নবী ﷺ-এর সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা।

১৪. নবী ﷺ-এর জন্ম উদযাপনের সবচেয়ে সুন্দর পদ্ধতি কী?

আমার কাছে এর উত্তর খুব পরিষ্কার।

শুধু একদিন নয়— সারা বছর নবী ﷺ-এর সুন্নাহ জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।

আল্লাহ বলেন— «لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ»

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।”

— সূরা আল-আহযাব: ২১

তাই নবী ﷺ-এর জন্ম উপলক্ষে আমরা যদি—

দরুদ পড়ি,

সিরাত পড়ি,

সুন্নাহ শিখি,

নামাজ ঠিক করি,

মিথ্যা ছেড়ে দিই,

অন্যের হক আদায় করি,

ব্যবসায় প্রতারণা ছেড়ে দিই,

পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ করি,

প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করি,

গরিবের পাশে দাঁড়াই,

এবং নবী ﷺ-এর চরিত্র নিজের জীবনে আনার চেষ্টা করি—

তাহলে সেটিই হবে নবী ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বাস্তব প্রমাণ।

১৫. ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয়

নবী ﷺ বলেছেন— «مَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي»

“যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয়, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।”

— সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

তাই আমি চাই— মিলাদের মঞ্চে নবী ﷺ-এর প্রশংসা যেমন হবে, তেমনি বাজারে তাঁর সততাও থাকবে।

দরুদ যেমন থাকবে, তেমনি নামাজও থাকবে।

জশনে জুলুশ যেমন থাকবে, তেমনি মানুষের হক আদায়ের শিক্ষা থাকবে।

নাত যেমন থাকবে, তেমনি সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকারও থাকবে।

কারণ নবী ﷺ-কে ভালোবাসা মানে শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করা নয়; তাঁর আদর্শ গ্রহণ করাও।

১৬. আমার চূড়ান্ত অবস্থান

তাই আমার অবস্থানকে কয়েকটি বাক্যে বলা যায়—

আমি নবী ﷺ-এর জন্মের আনন্দের বিরোধী নই।

আমি নবী ﷺ-এর জীবন আলোচনা ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের বিরোধী নই।

আমি দরুদ, সিরাত, নাত, দান-সদকা এবং সুন্নাহ শিক্ষা প্রচারের বিরোধী নই।

আমি সোমবারের রোজার হাদিসকে নবী ﷺ-এর জন্মের দিনের স্মরণের একটি সুন্নাহসম্মত দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করি।

কিন্তু বর্তমান যুগের প্রচলিত প্রতিটি মিলাদ অনুষ্ঠানকে হুবহু নবী ﷺ-এর সুন্নাহ বলে দাবি করি না।

আমি মিলাদে অংশগ্রহণ না করলেও মিলাদ পালনকারী মুসলমানকে কাফের বা পথভ্রষ্ট বলে দিই না।

আবার মিলাদের নামে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ হলে সেটাকেও সমর্থন করি না।

জশনে জুলুশকে সামাজিকভাবে বৈধ মনে করার সুযোগ আছে—কিন্তু এতে হারাম বা মানুষের কষ্ট হয় এমন কিছু থাকলে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

আর আমি নিজে জুলুশে না যাওয়ার কারণ হলো—

«আমি চাই নবী ﷺ-এর জন্মের আলোচনা যেন তাঁর সুন্নাহকে আড়াল না করে; বরং তাঁর সুন্নাহকে জীবিত করার মাধ্যম হয়।»

 শেষ কথাঃ

আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

“আপনি মিলাদ করেন কি না?”

এটা নয়।

আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

“আপনি মুহাম্মদ ﷺ-কে কতটা ভালোবাসেন এবং তাঁর সুন্নাহ আপনার জীবনে কতটা আছে?”

আল্লাহ বলেন— «قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ»

“তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”

— সূরা আলে ইমরান: ৩১

সুতরাং আসুন— মিলাদ নিয়ে পরস্পরকে কাফের না বানাই,

বিদআত নিয়ে পরস্পরকে গালি না দিই,

মতভেদকে শত্রুতায় পরিণত না করি।

বরং নবী ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ি, তাঁর সিরাত শিখি, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করি এবং তাঁর চরিত্র নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করি।

কারণ— «নবী ﷺ-এর জন্মের আনন্দ একদিনের হতে পারে; কিন্তু নবী ﷺ-এর সুন্নাহ আমাদের পুরো জীবনের জন্য।»

اللهم صل وسلم وبارك على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য বোঝার, সত্য গ্রহণ করার এবং প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক: আবু আইমান, ইসলামী আলোচক, বাংলাদেশ টেলিভিশন; খতীব, আল্লামা জালালুদ্দিন রুমি (রঃ) জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম।